‘এখন নাটককেই দর্শকের কাছে যেতে হবে’

Published January 15, 2026 by admin

চলতি জানুয়ারি মাসে ঢাকা শহরের তিনটি ভেন্যুতে মোট চারটি প্রদর্শনী নিয়ে ফিরছে নিনাদ-এর প্রথম প্রযোজনা ‘দ্য হিউম্যান ভয়েস’। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার সহযোগিতায় নির্মিত এই মঞ্চনাটকটি ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম মঞ্চে আসে এবং ধানমন্ডিস্থ আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তন ও মিরপুরস্থ বিবলিওন বুকস্টোর ক্যাফেতে মোট ৭টি প্রদর্শনী হয়।

এবার জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে শহরের তিনটি স্থানে চারটি প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে নাটকটির। মূল উদ্দেশ্য, শহরের নানা প্রান্তের দর্শকদের কাছে নাটকটিকে নিয়ে যাওয়া।

সেই সূত্রে ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি সেগুনবাগিচাস্থ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র স্টুডিও থিয়েটার হল, ২৩ জানুয়ারি বনানীস্থ সাতোরি একাডেমি অব আর্টস এবং ৩০ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ের আলোকি-তে অবস্থিত শালা নেইবারহুড আর্ট স্পেস-এ ফরাসি নাট্যকার জঁ কক্‌তো রচিত নাটকটি মঞ্চায়িত হতে যাচ্ছে।

প্রতিটি প্রদর্শনী শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টায়।

১৯৩০ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হওয়া একাঙ্কিক ও একক চরিত্রের এই নাটকটি একজন নারীর গল্প, যিনি তার প্রেমিকের সাথে শেষবারের মতো টেলিফোনে কথা বলছেন। প্রেমিকটি পরদিনই অন্য একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে, তাই প্রেমিকের সাথে এই শেষ টেলিফোন আলাপে ফুটে ওঠে নারীটির হৃদয়ভঙ্গ ও পরিত্যক্ত হওয়ার অস্ফুট আর্তনাদ এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার বেদনাকে সহ্য করতে না পেরে গভীর মানসিক অস্থিরতার চিত্ররূপ।

নাটকটি বাংলায় অনুবাদ ও রূপান্তর করেছেন প্রজ্ঞা তাসনুভা রূবাইয়াৎ, যিনি একইসাথে নির্দেশক হিসেবেও নাটকটির মঞ্চায়ন-ভাবনা ও সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রজ্ঞা ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে থিয়েটার, শিক্ষকতা, লেখালেখি ও অনুবাদ কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ‘দ্য হিউম্যান ভয়েস’ এর নাট্যভাবনাকে মঞ্চে বাস্তবায়িত করে তুলছেন অভিনেত্রী সাদিকা স্বর্ণা, যিনি গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে মিডিয়ায় অভিনয় ও মডেলিংয়ের সাথে যুক্ত রয়েছেন।

বলা দরকার, সাদিকা স্বর্ণা ২০১০ সালে লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় রানার আপ খেতাব অর্জন করেন। সেই সাথে থিয়েটার চর্চায় স্বর্ণার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, চারুকলা অনুষদ থেকে তার পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে আহরিত আবেগীয় পরিপক্বতা ‘দ্য হিউম্যান ভয়েস’ নাটকে তার চরিত্রাভিনয়ে সংযোজন করেছে মনস্তত্ত্বের বোঝাপড়া ও মানব-অধ্যয়নের এক অনন্য মাত্রা।

এই নাটকের সাউন্ডস্কেপ ডিজাইনে আজমাইন ইসমাম, সিনোগ্রাফিক ডিজাইনে তানজি কুন, প্রজেকশন ভিজ্যুয়াল নির্মাণে ধ্রুব দাস, কোরিওগ্রাফিক কম্পোজিশনে অমিত চৌধুরী ও আলোক প্রক্ষেপণে মোখলেছুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সেই সাথে, পোশাক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতামূলক ভূমিকা রেখেছেন ফ্যাশন ডিজাইনার আফসানা ফেরদৌসী। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ভাবনা থেকে উৎসারিত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন নাটকের সংলাপ, চরিত্রাভিনয় ও সার্বিক মঞ্চায়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

নাটকটির দৃশ্যভাবনা ও সার্বিক পরিকল্পনায় সহকারী হিসেবে আছেন আতিক পিয়াল এবং নাটকের প্রচারণা সংক্রান্ত ভাবনা, পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে সহযোগিতা করেছেন সজিব হাজরা।

ঢাকা শহরে একজন নাগরিকের থিয়েটার দেখার বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই নিনাদ ‘দ্য হিউম্যান ভয়েস’ নাটকটিকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, নাটমন্ডলের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো শহর জুড়ে ছড়িয়ে দিতে চায়। শহরের যানজট, কাজের চাপ আর দৈনন্দিন ব্যস্ততার কারণে অনেক দর্শকের পক্ষেই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও দূরের কোনও এলাকা থেকে সেগুনবাগিচা, বেইলি রোড কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে নাটক দেখার সুযোগ হয় না।

এই প্রসঙ্গে ‘দ্য হিউম্যান ভয়েস’ নাটকের নির্দেশক প্রজ্ঞা তাসনুভা রূবাইয়াৎ বলেন, ‌‘এখন আসলে নাটককেই দর্শকের কাছে যেতে হবে। দর্শককে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসে নাটক দেখার জন্য বেঁধে রাখলে মঞ্চ নাটকের বিস্তার ঘটবে না। বিভিন্ন বাস্তবতার কারণেই থিয়েটার চর্চা এখন একটা ছোট সার্কেলের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে নাটক নিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে না পারলে কয়েকদিন পরে দর্শকেরও সংকট হবে! সেই ভাবনা থেকেই আমরা নাটকটি এমনভাবে ডিজাইন করেছি, যাতে এটি অডিটোরিয়ামে যেমন মঞ্চস্থ করা যায়, তেমনি গ্যালারি বা বিকল্প পরিসরেও পরিবেশন করা সম্ভব হয়।’

বাংলাদেশের গতানুগতিক নাট্যচর্চায় একক অভিনয়ের এই নাটকটি একটি বিরল ও সাহসী প্রয়াস হিসেবে নিশ্চিন্তভাবে দর্শকের মনে দাগ কাটবে বলে নিনাদ-এর বিশ্বাস।

ঢাকা ট্রায়াল, জানুয়ারি ১৭, ২০২৬/এসএ/