সমালোচনা করলে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে: হাসনাত আবদুল্লাহ

Published April 26, 2026 by admin

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ক্যাম্পাসগুলো আবার অস্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে। অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। বিরোধী দলের মত দমনের জন্য মামলা করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে লেখার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হুইপকে সমালোচনা করলে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

রবিবার (২৬ এপ্রিল) বিকালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২১তম দিনের রাষ্ট্রপতি ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্টুন শেয়ার করে বিভিন্ন স্যাটায়ার, বিভিন্ন মকারিকে প্রমোট করছে, বিরোধী মতকে প্রমোট করছে, সেখানে এই সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত নয়টা ঘটনা ঘটেছে— যেখানে মত প্রকাশের জন্য বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “আমরা খুব আশাহত হই— যখন এই সংসদ এত রক্ত, এত লড়াই, এত ত্যাগের পরে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। কিন্তু এই সংসদ আবার আগের সেই বিষের সাইকেল, দোষারোপের সাইকেল, বিভিন্ন ট্যাগিংয়ের সাইকেল, মত দমনের নামে, বিরোধী মত দমনের নামে মামলার যে সাইকেল— আমরা সেখানে আবার চলে গিয়েছি।”

মত প্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের সময়ও ছিল

মত প্রকাশের স্বাধীনতা চেয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর সংসদে বলেন, “আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আগেও ছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের সময় ছিল। তবে সেটা সহমত প্রকাশের স্বাধীনতা। আমরা এই পার্লামেন্টের পরে আমরা শুধুমাত্র মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, আমরা দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে চাই। আমরা নির্ভয়ে ফেসবুকে ব্যাকস্পেস ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু আবার একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আবার একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা দেখলাম, সিলেক্টিভ এক ধরনের বিরোধিতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের সমাজের যারা গ্রহণযোগ্য এক ধরনের পলিটিক্যালি এলিট শ্রেণির নারীদের নিয়ে যখন সমালোচনা করা হয়, তখন সেটাকে নারীর বিরুদ্ধে হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যারা পলিটিক্যালি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী রয়েছেন, গার্মেন্টস কর্মী রয়েছেন, যারা এই দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, গ্রামগঞ্জের নারীরা-মায়েরা যারা রাত দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন— তাদের যখন গালি দেওয়া হয় সেটাকে আমরা নারীবিরোধিতা হিসেবে আমলে নেই না। এই ধরনের সিলেক্টিভ নারীবিরোধিতা করা, এই ধরনের সিলেক্টিভ নারী-সমালোচনা করার যে ধরনের প্রবণতা রয়েছে, সেই জায়গাগুলো থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।”

ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হচ্ছে

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি তুলে ধরে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আজ ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের সময় গেস্টরুম, গণরুমের কালচার ছিল। আমাদের সময় শিক্ষার্থী অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেতো। আমরা সেখানে দেখেছি, ক্ষমতাসীন দল কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুঁজি করে তাদের ক্ষমতা কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদী করার জন্য বাধ্যতামূলক রাজনীতি করাতো। আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবার গেস্টরুম-গণরুম কালচার চালু করার প্রয়াস শুরু হয়েছে। আবার বাধ্যতামূলক রাজনীতির কালচার শুরু করা হচ্ছে। আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন যারা রয়েছে তারা তাদের সন্তানদেরকে বিদেশে রেখে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেন। আর মধ্যবিত্ত সন্তানরা যাদের বাবা-মা কল-কারখানায় কাজ করে, তাদের সন্তানদের ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদরা ব্যবহার করে তাদের ক্যারিয়ারে ঝুকিতে ফেলে, নিজেদের সন্তানকে বিদেশে রেখে নিরাপদে রাখে আর পরের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।”

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আমরা এই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র নেতা তৈরির হাতিয়ার হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, পাঠ চর্চা, মনস্তাত্বিক সমৃদ্ধি হবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বুদ্ধিজীবী-গবেষক বাংলাদেশকে ও জাতিকে উপহার দিতে পারবো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র নেতা উৎপাদন করার এক ধরনের বিশেষ সার্কেলে পরিণত হয়েছে।”

মানবাধিকার কমিশনকে ল্যাপস করে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বারবার বলা হচ্ছে আরও শক্তিশালীভাবে মানবাধিকার কমিশন নাকি উত্থাপন করা হবে। সেখানে পুলিশ সংস্কার কমিশন, অর্ডিনান্স বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে— আরও পুনর্বিবেচনা সাপেক্ষে এই সংসদে উত্থাপন করা হবে। নিয়তটা যদি সহি থাকতো, ওয়েল ইনটেনশন যদি থাকতো— এই অর্ডিন্যান্সটাকে এখানে গ্রহণ করে পরবর্তীকালে কিন্তু সংশোধন করা যেতো।”

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমাদের জনগণের কাছে যেতে হবে, জনগণের আশা, সময়, স্বপ্নগুলোকে রাজনৈতিক ভাষার মধ্য দিয়ে, কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে সমন্বিতভাবে, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়াস আমাদের থাকতে হবে। আবার যদি আমরা বিভাজনের রাজনীতিতে যাই— তাহলে সেখান থেকে বিএনপি বেনিফিটেড হবে না, এনসিপি হবে না, জামায়াতে ইসলাম বেনিফিটেড হবে না। সেখান থেকে আমরা জুলাইয়ে যাদের পরাজিত করেছি তারা বেনিফিটেড হবে।”

তিনি আরও বলেন, “নির্মূলের রাজনীতি, বিনাশের রাজনীতি, দমনের রাজনীতি, পীড়ণের রাজনীতি যদি আমরা বাংলাদেশে আবার পরিচিত করি, সেখান থেকে এই সংসদের কেউ বেনিফিটেড হবে না। বেনিফিটেড হবে যারা আমাদের এই বাংলাদেশটাকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই অপশক্তি বেনিফিটেড হবে। সেজন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”