সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুলের ঘনিষ্ঠ সাব-রেজিস্টার মাইকেল বিআরএসএ এর মহাসচিব

মাইনুল হোসেন পিন্নু:

ঢাকার খিলগাঁওয়ের সাব-রেজিস্টার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ বিগত আওয়ামী লীগ (কার্ক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের খনিষ্ঠ সহচর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর খোলস পাল্টে নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা পরিচয় দিয়ে রেজিস্ট্রেশন অফিসগুলোয় ব্যাপক দৌরাত্ম্য ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পদায়ন নিয়েছেন নিজের পছন্দমত খিলগাঁওয়ের সাব-রেজিস্টার পদে। প্রভাব খাটিয়ে হয়েছেন বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিআরএসএ) এর মহাসচিব।

অভিযোগে জানা গেছে, ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বদলি বাণিজ্যসহ নানান প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার একাধিক সহকর্মী জানান, ওই সময়ে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন মাইকেল। এ বিষয়ে তদন্ত করে সাব-রেজিস্টার মাইকেলের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আব্দুল মোতালেব নামে এক ব্যক্তি।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ আছে, সাব-রেজিস্টার হিসেবে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ বাংলাদেশের সবচেয়ে লোভনীয় পোস্টিং ভোগ করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের দোহাই দিয়ে ব্যাপক প্রভাব খাটিয়েছেন। ঢাকার সাভার উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে অসংখ্য দলিলে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন। দলিলদাতা-গ্রহীতা, দর্শনার্থী ও দলিল লেখকদের সঙ্গে প্রায়ই দুর্ব্যবহার করতেন মাইকেল।

অভিযোগে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার টঙ্গী রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ আয় করেন। দায়িত্ব পালনকালে কাউকে আমলে নিতেন না মাইকেল। এছাড়া গাজীপুরের যুগ্ম সাব রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। তবে সর্বক্ষেত্রে তার অবৈধ অর্থ উপার্জনের শেল্টারদাতা ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। মাইকেল স্বেচ্ছায় নিজেকে আওয়ামী ঘরানার সাব-রেজিস্টার হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

আইনমন্ত্রীর আশির্বাদে রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন মাইকেল মহিউদ্দিন। সেখানেও তিনি অবৈধভাবে ‘কোটি কোটি’ টাকা উপার্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর তিনি মুন্সীগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অল্প কিছু দিন দায়িত্ব পালন শেষে তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অবস্থিত খিলগাঁও সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে অতিসম্প্রতি যোগদান করেন।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, আওয়ামী আমলের পুরো সময় জুড়ে তিনি আওয়ামী বন্দনায় ব্যস্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীতে তার অবৈধ আয় বৈধ করতে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করেন এ মাইকেল। যে কারণে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে তিনি সারাদেশে রেজিস্ট্রেশন অফিসগুলোতে তার দাপট দেখিয়েছেন। কিন্তু ৫ আগস্টে স্বৈরাচার পতনের পর খোলস পাল্টে নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা পরিচয় দিয়ে রেজিস্ট্রেশন অফিসগুলোতে ব্যাপক দৌরাত্ম্য ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সবচেয়ে লোভনীয় অফিস হচ্ছে খিলগাঁও। যে কারণে দুর্নীতিবাজ ও বর্ণচোরা সাব-রেজিস্টার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ উচ্চ মহলে তদবির করে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বেছে নিয়েছেন। এরই মধ্যে তিনি প্রভাব খাটিয়ে রেজিস্ট্রেশন সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব হয়েছেন। আর এতে বর্তমানে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন। তার ভয়ে কেউ কথা বলতে চাইছে না।

অভিযোগ মতে, প্রতিদিন ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অবৈধ আয় করছেন আগের মতই। তার কয়েকজন সহকর্মী বলেছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর আইনমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন কীভাবে বর্তমান আমলেও ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন? তারা বলছেন, অর্থের বিনিময়েই তিনি তার নতুন পরিচয় জায়েজ করে নিয়েছেন।

আওয়ামী আমলে প্রচণ্ড ক্ষমতাধর এই দুর্নীতিবাজ সাব-রেজিস্টার বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও প্রকাশ্যে কর্তৃপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কর্মক্ষেত্রে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছেন। তদন্ত করে মাইকেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী কয়েকজন।

তারা জানান, মাইকেলের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাড়ি কসবা উপজেলায়। যে কারণে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন।

ওই সময়ে তার নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে র‌্যাব, পুলিশ ও আওয়ামী মাস্তানদের লেলিয়ে দিতেন। যে কারণে তার বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতেন না। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিবর্তন করার কারণে সেই আগের অবস্থাই বিদ্যমান রেখেছেন তিনি, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন মাইকেল।

অভিযোগ আছে, রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যে লিপ্ত হন। ২০২৩ দলিল লেখকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্ম বিরতি পালন করেন। সেখানেও তিনি বিক্ষোভকারীদের বাধা প্রদান করেন এবং ভয়-ভীতি দেখিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। আওয়ামী আমলে কেউ ন্যায় বিচার পায়নি দুর্নীতিবাজ ক্ষমতালোভী সাব-রেজিস্টার মাইকেল মহিউদ্দিনের আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে। ক্ষমতা প্রতিপত্তি ও অবৈধ অর্থের জেরে সবাইকে ম্যানেজ করে ফেলার কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ প্রায় এক হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ও বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও কৃষিজমি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ মতে, ঢাকার আফতাব নগর এলাকায় তার কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশের বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাছাকাছি। এছাড়া গুলশান-১ এর একটি বহুতল ভবনে তিনি দুই তলা নিয়ে ডুপ্লেক্স বাসভবনে বসবাস করছেন। গুলশান, নিকেতন, হাতিরঝিল ও ধানমন্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তার একাধিক উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে কিছু সম্পত্তি তার স্ত্রী ও স্বজনদের নামেও রয়েছে বলে অভিযোগে জানা গেছে।

শুধু রাজধানীতেই নয়, তার নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও নবীনগর এলাকায় বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, মাছের ঘের ও খামারের তথ্যও উঠে এসেছে অভিযোগে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি নন-ক্যাডার থেকে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। একই সময়ে তার পরিবারের সদস্যরাও সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পান বলে দাবি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এসব অভিযোগ সঠিক নয়। সরকারি চাকরি করি, যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তাদের আদেশ মেনেই চলতে হবে। এর বাইরে কারও সঙ্গে অতিরিক্ত সম্পর্ক ছিল না। আর আমি কোনও দুর্নীতির সঙ্গেও জড়িত না। সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে মাইকেল বলেন, এসব সম্পত্তি তার না এটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার নামে প্রচার করা হচ্ছে।

/এমএইচপি/

Leave a Reply