অন্য ভাষার শব্দে নয়, সমস্যা শব্দ প্রতিস্থাপনের রাজনীতি

কাবেরী গায়েন: বাংলা ভাষায় কিছু শব্দের ব্যবহার নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে ফেসবুকে, আরো চলবে। তর্ক স্বাস্থ্যকর। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, ফরাসী, ওলন্দাজ, স্প্যানিশ, জাপানিজ, চাইনিজ বা যে কোন শব্দের যথাযথ অনায়াস ব্যবহারই ভাষাকে সমৃদ্ধ করে, করতে পারে সন্দেহ নেই। কিন্তু যদি ব্যবহার অনায়াসে না হয়ে কোন গোষ্ঠীর আরোপণের মধ্য দিয়ে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে আরোপণের উদ্দেশ্য এবং প্রক্রিয়া বিষয়ে, শব্দ ব্যবহারের রাজনীতি নিয়ে।

 

প্রতিস্থাপনের রাজনীতিটা যদি একটু খেয়াল করি। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর পাশাপাশি  “জয়বাংলা’ করে দিছে”, ‘জয় বাংলা ভরে দেব’ যখন একই বক্তা চোখ আর মুখের বিকৃত ইঙ্গিত করে ছেড়ে দেয় ইউটিউবে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না এদের শব্দ এবং স্লোগান ব্যবহারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী বা কেনো জয় বাংলা-কে অশ্লীল গালি হিসেবে ব্যবহার করে ইনকিলাব জিন্দাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়। আর স্বাধীনতা বা মুক্তিকে আজাদী দিয়ে। ন্যায় বিচারকে ইনসাফ দিয়ে। আর চেষ্টাটা করছেন কারা?

 

পাকিস্তান আমলে বহু চেষ্টা হয়েছে বাংলা ভাষার ধর্মীয়করণের। খুব বেশি লাভ হয়নি। আমাদের স্কুলজীবনে একবার জলবাঁধকে পানিবাঁধ করাসহ বেশ কিছু শব্দ পাল্টানোর উদ্যোগ হয়েছিল। তারপর কী হয়েছিল এবিষয়ে অনুসরণ করা হয়নি। তবে ‘জয় বাংলা’কে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘বাংলাদেশ বেতার’-কে রেডিও বাংলাদেশ দিয়ে প্রতিস্থাপনের রাজনীতির ভেতর দিয়ে আমরা বেড়ে উঠেছি।  এরপরে কুড়ি শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে আরেক ধামাকা গেছে। যেমন, ব্যাখ্যা-কে তফসির, তথ্যসূত্রকে দোহাই, চেষ্টাকে কোশেশ ইত্যাদি দিয়ে প্রতিস্থাপনের। এই চেষ্টা যারা চালিয়েছেন, তাদের অনেকেই নিজেদের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বলে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যদিও অনেকের ক্ষেত্রেই তারা ঠিক কোন বামপন্থী দল করেছেন, আমি জানি না। গত এক দশকে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটা ধামাকা এসেছে। তারা আজাদী, ইনসাফ, মজলুম, ইনকিলাব এসব শব্দ ব্যবহার করছেন। প্রত্যেকটা শব্দই সুন্দর এবং আসলেই কোন সমস্যা নেই ব্যবহারে । প্রশ্ন হচ্ছে, কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তান আমলে যারা করেছেন তারা করেছেন পাকিস্তান পন্থার নামে, ইসলাম রক্ষার তাগিদে। বলে কয়ে। এখন যারা করেছেন তাদের অনেকেই মূলত  বামপন্থী রাজনীতির বলে পরিচিত। তারা যে শুধু বামপন্থার পরিচয়ধারী  এই সময়কালে তাই-ই নয়, তারা নিজেদের উচ্চতর বামপন্থী দাবি করে ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘদিনের বামপন্থী দলগুলোর ছেলেমেয়েদের মেধা-যোগ্যতা-ত্যাগকে উপহাস করেছেন এসব কথার আড়ম্বরে, তাদের গায়ে অদক্ষতার তকমা জড়িয়েছেন এবং নানা কিসিমের বামপন্থার হদিস দিয়ে চলেছেন নানা শব্দ এবং স্লোগান ব্যবহারের রাজনীতি দিয়ে। দিনশেষে মেধাবী নামধারী বামপন্থীরা হয় বিএনপির টিকিট কেটে কৃতার্থ হয়েছেন, অন্যরা এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন, সেই এনসিপি জামাতে গেলে এনপিএ বানিয়েছেন। এদের সাথে আছেন ঝাঁ চকচকে বুদ্ধিজীবীরা।  মজার ব্যাপার হল তাদের সবার যুক্তি এবং ভাষা প্রায় এক। অন্তত সাম্প্রতিক ভাষা বিতর্কে এবং মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের মূল ঘটনা থেকে সরিয়ে অন্যতম ঘটনা হিসেবে প্রতিস্থাপনের রাজনীতিতে।

এই প্রবণতাকে তাই ব্যক্তিবিশেষের হিসেবে না দেখে এক পরিসরের প্রবণতা হিসেবে দেখাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে। কিছু শব্দের ব্যবহারের বিষয়ে কেবল আলোকপাত না করে যে পরিসর তৈরির চেষ্টার অংশ হিসেবে এইসব শব্দ ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে সেই উদ্যোগটা চিহ্নিত করা বেশি জরুরি। এই পরিসরের কেউ কেউ  সাম্প্রদায়িকতা ঢেকে রাখার ধারও আর ধারছেন না।

একটা ছোট্ট উদাহরণ  দেই। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে নিতাই রায় চৌধুরীকে। এই নিয়োগ যে ঠিক হয়নি সেটা বোঝা গেছে নিতাই রায় চৌধুরীর এক ভাইরাল হওয়া ক্লিপেই। সেটা সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে তার অযোগ্যতা প্রমাণ করে। বাংলাদেশের একজন মোটামুটি বিখ্যাত কবি এই ক্লিপ প্রকাশ্যে আসার আগেই কামান দাগিয়ে দিলেন যে এই মন্ত্রীর নির্বাচন ভারত করেছে। ভারত এদেশের সংস্কৃতির ঠিকাদারি নিজ হাতে রাখতে চায় তাই। এই বিখ্যাত মানুষ নিশ্চয়ই জানেন যে একজন দুর্বল ধরণের মন্ত্রীর উপর ভরসা করে ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখার দরকার নেই আর। তাদের সংগীত, চলচ্চিত্র, সিরিয়াল, ফ্যাশন,  আইটি ইন্ডাস্ট্রির বিশ্বব্যাপী বাজারের প্রভাব থাকতে বাংলাদেশের সংস্কৃতি নিয়ে তাদের মাথা ঘামানোর আসলেই প্রয়োজন নেই কারন এই প্রভাব এখন মোটামুটি সবকিছুকে গিলে নিয়েছে। তিনি জেনেই এই সাম্প্রদায়িক বক্তব্যটি ছড়িয়ে দিলেন কারন নিতাই রায়চৌধুরী হিন্দু। তার সেই মন্তব্যের নীচে সাম্প্রদায়িক হাট বসল। এই যে প্রক্রিয়া, এটা পরিস্কার সাম্প্রদায়িক প্রক্রিয়া। অথচ নিতাই রায়চৌধুরীর সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে অযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা হতেই পারত। হওয়া উচিত। কিন্তু উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িকতার বীজতলা তৈরি, এবং তিনি সফল। কাজেই ন্যারেটিভ নির্মাণের প্রক্রিয়ায় কীভাবে শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। নিতাই রায়চৌধুরীকে সমালোচনা করা সমস্যা না, সমস্যা তার হিন্দু পরিচয়ের সাথে ভারতকে ট্যাগ করে দেয়ার রাজনীতি এবং তার মধ্য দিয়ে এদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর জীবন আরো নাজুক করে তোলা। অফিস-আদালতে যেমন কোন নারীর কোন অদক্ষতার সমালোচনাই যথেষ্ট নয়, তার নারী পরিচয়কে সেই অযোগ্যতার সাথে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে জ্বালা মেটানো। সেটা যেমন পরিস্কার মিসোজিনি, এটাও তেমন নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকতা।

এক স্নেহভাজন তাত্ত্বিককে দেখলাম কীভাবে কানহাইয়া কুমার আজাদী বললে আমরা অনুরণিত হই এবং ইত্যাদি প্রভৃতি মর্মে এক তালিকা দিয়েছেন এই সাম্প্রতিক শব্দ ব্যবহার বিতর্কে। আমার সত্যিই কোন আপত্তি নেই এসব শব্দে। কমলা ভাসিন যখন আজাদী ব্যবহার করেন, আমার ভাল লাগে। ওটা কমলা ভাসিনের জন্য যত অনায়াস শব্দ অ্যাম্বার জন্য অনায়াস নয়।  আমি নিজে অনায়াসে প্রচুর আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করি। ইনকিলাব জিন্দাবাদ এক সময় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির স্লোগান ছিল, এখনো আছে। আমি নিজে গেয়েছি, ”ইনকিলাব জিন্দাবাদ রক্তপতাকা/ এই পতাকা শ্রমিকের রক্তপতাকা/ দিক নিশানা সংগ্রামের মুক্তিপতাকা।” সিপিবি এই গান দীর্ঘকাল অনায়াসে গেয়ে আসছে। একদিকে সিপিবিকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দোসর হিশেবে দাগিয়ে পার্টি অফিসে হামলা করার জমিন প্রস্তুত করেছে যারা গত আঠারো মাসে,  তারাই সিপিবির গাওয়া ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ নতুন করে নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করছেন।  যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’ বাদ দিয়ে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর আনজাম করা হয় বিপুল উদ্যমে নতুনভাবে, এই নতুনভাবে শব্দটায় মনযোগ আকর্ষণ করতে চাই, তখন বোঝার চেষ্টা করি রাজনীতিটা। ভারতের সবকিছু পরিত্যাজ্য হলেও ভারতের ছাত্রদের স্লোগান তখন নিষিদ্ধ তালিকায় পড়ে না, যদিও সব কিছুতে ভারতীয় গন্ধ এই তাত্ত্বিকেরাই আবিস্কার করেন এবং অবশ্যই পরিত্যাজ্য ঘোষনা করেন। ‘জয় বাংলা’, ‘জিয়ে সিন্ধ’- এসব স্লোগান বাংলাদেশ আর সিন্ধু প্রদেশের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের স্লোগান, মাটি থেকে উঠে আসা। তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়বাহী। সেটাকে বাদ দিয়ে ভারতীয় তকমা সাঁটানো কোন স্লোগানকে ভারতবিদ্বেষী জনগণ যখন আপন করার প্রভূত কোশেশ করেন, তখন এর রাজনীতি নিয়ে কথা ওঠাটা স্বাভাবিক। আলোচনাটা আরো আগেই ওঠা দরকার ছিল।

প্রতিস্থাপনের রাজনীতিটা যদি একটু খেয়াল করি। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর পাশাপাশি  ‘জয়বাংল’ করে দিছে’, ‘জয় বাংলা ভরে দেব’ যখন একই বক্তা চোখ আর মুখের বিকৃত ইঙ্গিত করে ছেড়ে দেয় ইউটিউবে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না এদের শব্দ এবং স্লোগান ব্যবহারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী বা কেনো জয় বাংলা-কে অশ্লীল গালি হিসেবে ব্যবহার করে ইনকিলাব জিন্দাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়। আর স্বাধীনতা বা মুক্তিকে আজাদী দিয়ে। ন্যায় বিচারকে ইনসাফ দিয়ে। আর চেষ্টাটা করছেন কারা? এবারের নির্বাচনে জামায়তের পক্ষে সরাসরি জীবনপ্রাণ ঢেলে দেয়া ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার যখন ভারতীয় বামপন্থী রাজনীতির স্লোগান ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ব্যবহার করেন তখন চোখ বন্ধ করে মার্শাল ম্যাকলুহান সাহেবের কথায় ফেরত যাওয়াই যায়- ‘মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ”।

আমার একসময়ে একটা প্রিয় কৌতুহল ছিল অক্সফোর্ড অভিধানে প্রত্যেক সংস্করণে তো বটেই, প্রতি বছরেই যে নতুন শব্দের তালিকা যুক্ত করা হত, সেসব শব্দে। মজার ব্যাপার হল, আমার চোখের সামনেই দেখেছি টিকিয়া-কেবাব-তান্দুরি এসব শব্দ যুক্ত হয়েছে অক্সফোর্ড অভিধানে এসব খাবার যুক্তরাজ্যের রসনায় জায়গা করে নেবার সাথে সাথে। এই আত্মীকরণ চমৎকার। নতুন বিষয়ের সাথে নতুন নাম যুক্ত হয়েছে। ইংরেজিকে ডেভিড অ্যাটেনবরো তো বলেছেন ফ্রেঞ্চ আর জর্মন ভাষা এবং শব্দের এক স্যান্ডুইচ, আর  মূল এসেছে ল্যাটিন থেকে, আমাদের যেমন সংস্কৃত-পালি-প্রাকৃত-অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষা তৈরি হয়ে যুক্ত হয়েছে নানা বিদেশি শব্দ।এই আত্মীকরণ স্বাস্থ্যকর। ভাষা সমৃদ্ধ হয়। ভাষা বহতা নদীর মত। সমস্যা অন্য জায়গায়। ন্যারেটিভ নির্মাণের রাজনীতিতে। অবশ্য ন্যারেটিভ শব্দটা ইদানিং অতি ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে গেছে।

আমি একটা ছোট স্লোগানের উল্লেখ করতে চাই-  “ফিক্কে-কুল্লে-নিজামিন”। ‘ফিক্কে-কুল্লে-নিজামিন’ অর্থ আমি জানি না। আলাদাভাবে এই শব্দবন্ধের প্রতি আমার কোন্ বিরাগ-অনুরাগ কিছুই নেই। আমার ধারনা সাধারণ শিক্ষার্থীরাও জানেন না এর অর্থ। কিন্তু কী কারনে একটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের একাংশ এই স্লোগান ব্যবহার করল সেটা বুঝতে একটু সময় লেগেছে। সেই ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কী অর্জিত হলো সেটা অর্থবাহী। তাহলে ডিকোড করেন অর্থ। এইখানে আসে ভাষার অর্থ যে আসলে প্রেক্ষিত অনুযায়ী নির্মিত হয় সেই প্রসংগ। সোস্যুর বিস্তর লিখেছেন এ বিষয়ে।  সেই প্রেক্ষিতের সাপেক্ষে অর্থ পেতে হলে এই স্লোগান দিয়ে একটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন থেকে বেরিয়ে যাওয়া, সংগঠনটি বিভক্ত হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী যোগ করল প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে সেটা হিসেব করতে পারলেই অন্তর্নিহিত রাজনীতিটা পরিস্কার হবে। হাতে রইলো পেন্সিল। ফেসবুকবাসীকে সাক্ষী রেখে বলি যে এই স্লোগানকে কেন্দ্র করে একটি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের যে বিবর্তন হল তার ভালমন্দ নিয়ে কোন মন্তব্য নেই আমার কিন্তু ভবিষ্যতে কেউ এই স্লোগান ব্যবহার করলে এই প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষে এই স্লোগানের অর্থ নির্মিত হবে।

সারোয়ার ফারুকির টেলিভিশন নাটক, এবং সিনেমায় ভাষা নিয়ে অনেক কেরামতি হয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক ঝগড়া-ঝাঁটি হয়েছে। কিন্তু যে আলোচনাটা উঠলোই না তা হল,  ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হাতে বানানো বাংলার মতোই ফারুকির বাংলাও বানানো বাংলা। দেশের সব জায়গার মানুষেরা এই একই ভাষায় কথা বলেন না। এমনকি ঢাকার আঞ্চলিক ভাষাও এটি নয়। আঞ্চলিক বাংলা এক জিনিস আর এক জগাখিচুরি বাংলাকে ‘মান’ বানানোর প্রজেক্ট অন্য জিনিস। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কখন কীভাবে ভাষাকে ব্যবহার করা হয়, এবং কী যুক্তি হাজির করা হয় প্রতিস্থাপনের রাজনীতিতে সেটা একটু যত্ন করে দেখলেই বোঝা যায়।

কোন শব্দ হঠিয়ে কোন শব্দের ব্যবহার হচ্ছে  কোন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য, শুধু এইটুকু বুঝলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ দিয়ে ‘জয় বাংলা’ প্রতিস্থাপনের রাজনীতিটা বোঝা যাবে। এইটুকু বোঝার পরেই দেখবেন সহজ হয়ে আসবে কেনো নজরুলের

‘নীল সিয়া আসমা লালে লাল দুনিয়া,–

‘আম্মা ! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’।

কাঁদে কোন্ ক্রদসী কারবালা ফোরাতে,

সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে !

রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া দামেশকে–

‘জয়নালে পরাল এ খুনিয়ারা বেশ কে?’

পড়লে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনে না হয়ে সবার চোখে আঁসু আনে, আর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলার পরে কেনো একজোড়া ধূর্ত  হিলহিলে চোখ ভেসে ওঠে আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে।

নজরুলের কবিতা এসব শব্দের অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে। অন্যদিকে একদল মানুষ বাংলায় ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রচুর সুন্দর শব্দের উচ্ছেদ ঘটিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ভারতেরই নানা অঞ্চলে ব্যবহৃত শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করছেন। পার্থক্যটা উদ্দেশ্যের। পার্থক্যটা সৃজনশীলতার সাথে ফেরেব্বাজি রাজনীতির। এই রাজনীতিটা বুঝলে ভাষা ব্যবহারের রাজনীতিটাও বোঝা সহজ হবে। সহজ পদ্ধতি হল, এসব ব্যবহার কি স্বতঃস্ফূর্ত না আরোপিত? যদি আরোপিত হয়, তবে সেই আরোপণের রাজনীতিটা কী? কে ব্যবহার করছেন, কোন শব্দকে কী কারণে উচ্ছেদ করছেন, সেটা বোঝা। নয়তো নতুন শব্দ ভাষাকে বহমান রাখে। সমৃদ্ধ করে। এবং অবশ্যই গ্রহণীয়। অবশ্য যেসব শব্দের নতুন ব্যবহার নিয়ে কথা উঠেছে, এসব শব্দের কোনটাই নতুন নয় এবং অনেক শব্দেরই রাজনৈতিক ব্যবহার অতিক্রম করে বাংলাদেশে নতুন শব্দ এবং স্লোগান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরে ।

কু-তর্কে জড়াবো না ভেবেছিলাম। কিন্তু যখন চিরশত্রু ভারতে কী কী শব্দের ব্যবহার হয়, সেই তালিকা হাতে ধরিয়ে দেয়ার কোশেশ চলে নিজের ভাষার শুদ্ধ-সুন্দর শব্দের ব্যবহার তুলে দেয়ার উদ্দেশ্যে, তখন জানানো দরকার এই নিরীহ তালিকার নীচের রাজনীতিটা একেবারে যে কেউ বোঝেন না, এমন নয়। এবং এবার বোকা বানানো খুব সহজ হবে এমনও নয়। যে বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, চেয়ারকে কি তবে কেদারা বলা হবে, তাদের প্রতি বিনয়ের সাথে বলাই যায়, হিন্দিতে কুর্সি এখনো চলে আর টেবিলকে মেজ বলেন এখনো হিন্দিভাষীরা। এটা হিন্দী ভাষার শক্তির দিক। এই বাংলাতে আস্ত চেয়ার ঢুকেছে বেশিদিন হয়নি। আরাম কেদারা, মাদুর, জলচৌকি, তাকিয়া, পিঁড়ি, মোড়া এসবেই বসতেন সকলে। রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রেও এসবেরই উল্লেখ পাওয়া যায়। চেয়ার-টেবিল বাঙ্গালির ঘরে ইংরেজ শাসনামলে চেয়ার-টেবিল হিসেবেই ঢুকেছে। যেমন ইংরেজিতে ঢুকেছে কেবাব-তান্দুরি। আর হ্যাঁ, কেদারা যে চেয়ারের চেয়ে হতকুচ্ছিত শব্দ সেটাই বা কে নির্ধারণ করলেন? ধারনা করি, এসব তর্ক আসলে মূল শব্দগুলো নিয়ে যে কথা উঠেছে সেসব লক্ষ্যভ্রষ্ট করার জন্যই।

স্বাধীনতা, জয় বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয়, মুক্তি, ন্যায়বিচার এসব শব্দ বাংলা ভাষার শক্তিমত্তার দিকটাই দেখায় শুধু নয়, এসব শব্দ ব্যবহারের ইতিহাস আমাদের দেশের জন্মকালীন ইতিহাসের সাথে জড়িত। আবার আজাদী, ইনসাফ এসবও দিব্য শব্দ। কিন্তু শেষের শব্দগুলো দিয়ে  প্রতিস্থাপনের দরকারটা যে আসলে কেনো যদি তারা একটু বুঝিয়ে বলতেন! কানহাইয়া কুমার আজাদী ব্যবহার করেন এটা খুব যৌক্তিক শোনায় না স্বাধীনতা বা মুক্তি শব্দের প্রতিস্থাপনের জন্য। আর ‘জয় বাংলা’কে নিজেরা ত্যাগ করে আওয়ামী দখলদারিত্বের অভিযোগটাও বেশ। এক ঢিলে দুই পাখি মারার চাল- একদিকে ‘জয় বাংলা’কে পরিত্যাগ করার যুক্তি দেখানো গেল আওয়ামীলীগকে দোষারোপ করে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধকে খারিজ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের মূল স্লোগানকে গালিতে পরিণত করা হল, কখনোবা অপাংতেয় করা হল, নতুন স্লোগানও  প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য হাসিল করা গেল। অথচ নিয়ত ভাল থাকলে তো আপামর জনসাধারণের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিকে আওয়ামীলীগের হাত থেকে উদ্ধার করে জাতীয় জীবনে সবার করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাটাই করা উচিত ছিল। কিন্তু রাজনীতি যখন মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা, নিদেনপক্ষে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা, তখন ‘জয় বাংলা কইরা দিমু’ ‘জয় বাংলা হান্দাইয়া দিমু’র পাশাপাশি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাই প্রকট হবে। এই প্রজেক্টে কোন্ কোন্ শক্তি যুক্ত হয়, সেটা দেখা একটা আনন্দময় অভিজ্ঞতা হতে পারে, যারা দেখতে চান।

ভাষা প্রসংগে কোন শেষকথা নেই। ভালো কাজ হল নতুন নতুন ভাষা শেখা। নতুন শব্দ ভান্ডার নিয়ে আসা আমাদের ভাষা ও সাহিত্যে। নিত্যদিনের কথায়-কাজে। শুধু যেনো একটু খেয়াল রাখি নিজের ভাষার সুন্দর, অর্থবহ এবং সবচেয়ে প্রিয় শব্দগুলোকে প্রতিস্থাপনের রাজনীতির দিকে। কে করছেন, কী উদ্দেশ্যে করছেন, কো্ন্ সময়ে করছেন। অন্য ভাষার শব্দের ব্যবহার স্বাগত, কিছু বিশেষ শব্দের প্রতিস্থাপনের রাজনীতিটা মাথায় থাকুক।

কাবেরী গায়েন
অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

Leave a Reply