মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদেরদের জন্য সংসদে শোক  

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করা হল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন এবং বিএনপি দলীয় এক নেতার নাম।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) প্রথম দিনের অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে সংসদীয় রীতি অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা মতিয়া চৌধুরী এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ডা. এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ মোট ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব আনা হয়।

এব প্রস্তাব উত্থাপনের পর জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শুরা সদস্য মীর কাসেম আলী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে।

পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান। বিএনপির সাবেক এমপি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামও যুক্ত করা হয়। আলোচনা শেষে জাথীয় সংসদে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ। আর দেলওয়ার হোসেন সাঈদী ছিলেন সংসদ সদস্য।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওই সাতজনই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। এদের মধ্যে ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাকি ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আর আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত সাঈদী কারাগারে মারা যান।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের দণ্ডিত হন ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) স্পিকার নির্বাচনের পর তার সভাপতিত্বে প্রথম অধিবেশন শুরু হলে খালেদা জিয়াসহ দেশি বিদেশি বিশিষ্টজন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব আনা হয়।

শোকপ্রস্তাব উত্থাপনের পর চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম আরও কয়েকটি নাম যুক্ত করার অনুরোধ জানান। তার প্রস্তাবে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছাড়াও ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মশিউর রহমানের নাম যুক্ত করার কথা বলা হয়। পরে স্পিকার তা অনুমোদন করেন। এ সময় স্পিকার বলেন, তারা মাওলানা…. প্রথিতযশা’ নেতা ছিলেন।

এরপর বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান তার বক্তেব্যে বলেন, শোকপ্রস্তাবে কিছু নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া নামগুলো বলার জন্য তিনি বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে কথা বলার অনুরোধ করেন শফিকুর রহমান।

তাহের বলেন, শোকপ্রস্তাব একপেশে করে তৈরি করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সংসদকে নিরপেক্ষ ও প্রাণবন্ত করতে আরও সচেতন হওয়া দরকার। এ সময় তিনি আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে শোকপ্রস্তাবে তা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

তিনি মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুস সোবহান, শেখ আনছার আলী, রিয়াসাত আলী, আবদুল খালেক মণ্ডল, হাফেজা আছমা খাতুন, রোকেয়া আনছার, সুলতানা রাজিয়া, রাশেদা খাতুন, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, এ কে এম ইউসুফ, নাজির আহমেদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ করেন।

তাহের আরও বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গে শোকপ্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামীর বদলে হেফাজতে ইসলামী বলা উচিত।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহতদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সেখানে প্রায় দুই হাজার শহীদের কথা বলেন এবং শরিফ ওসমান হাদীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা যাদের নাম বলেছেন, সেগুলো শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শোক প্রস্তাবে আরও কিছু নাম সংযোজিত হবে বলেও জানান স্পিকার। তারা হলেন— ছালেহা খানম, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, কামাল ইবনে ইউসুফ ও নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু।

 

এরপর প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম আরও কয়েকটি নাম যোগ করার প্রস্তাব দেন। তিনি গৌতম চক্রবর্তী, এম এ মতিন, মুজিবুর রহমান মঞ্জু, আনোয়ারুল হোসেন খান এবং এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার কথা বলেন।

অন্য কোনও সাবেক সংসদ সদস্য বা বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম বাদ পড়ে থাকলে তা সংসদ সচিবালয়কে জানাতে অনুরোধ করেন।

পরে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ফ্লোর নিয়ে শরিফ ওসমান বিন হাদী, আবরার ফাহাদ এবং ফেলানী খাতুনের নামও শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন। স্পিকার তখন বলেন, এই নামগুলোও শোকপ্রস্তাবে যুক্ত হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস (জর্জ ম্যারিও বেরগোগলিও) ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরণ্যে নাগরিক ও ব্যক্তিত্ব যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের স্মরণ করা হয় শোক প্রস্তাবে।

জুলাই যোদ্ধা আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শাহারিয়ার খান আনাস, মেহেদি হাসান জুয়েল, ফারহান ফাইয়াজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বরণ্যে নাগরিকদের নামও রাখা হয় শোক প্রস্তাবে।

এরপর প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়।

তার আগে প্রয়াতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ প্রয়াতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।

প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী দিনে অধিবেশন শুরু হয়। পরে সর্বসম্মতিতে হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার এবং কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।

 

Leave a Reply