নিরাপদ পানির এসডিজি লক্ষ্যে কতটা এগিয়েছে বাংলাদেশ?
নিরাপদ পানির এসডিজি লক্ষ্যে কতটা এগিয়েছে বাংলাদেশ?
মাইনুল হোসেন পিন্নু:
সবার জন্য নিরাপদ পানীয় জল ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) অন্যতম লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার থাকলেও বাংলাদেশে নিরাপদ পানীয় জল, নিরাপদ স্যানিটেশন এবং বর্জ্যপানি পরিশোধনের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাবিষয়ক তথ্যভান্ডারের ২০২৪ সালের হিসাবে, দেশের ৫৯.১ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত পানীয় জলের সেবা পাচ্ছেন। নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত স্যানিটেশন সেবা পাচ্ছেন ৩৭.৩ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে, গৃহস্থালি বর্জ্যপানির মাত্র ১৬.৩ শতাংশ নিরাপদে পরিশোধিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের এসডিজি-৬ সূচকে নিরাপদ পানীয় জলের অর্থ শুধু পানির উৎস থাকা নয়। পানির উৎস বাড়ির আঙিনায় বা প্রাঙ্গণে থাকতে হবে, প্রয়োজনের সময় পানি পাওয়া যেতে হবে এবং তা জীবাণু ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দূষণমুক্ত হতে হবে। একইভাবে নিরাপদ স্যানিটেশন বলতে এমন ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে মানুষের বর্জ্য নিরাপদে নিষ্কাশন ও ব্যবস্থাপনা করা হয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় পানীয় জলের সেবার আওতা ২০০০ সালে ছিল ৫৫.৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৫৯.১ শতাংশ। অর্থাৎ, ২৪ বছরে অগ্রগতি হয়েছে ৩.৮ শতাংশ পয়েন্ট। একই সময়ে নিরাপদ স্যানিটেশন সেবার আওতা ১১.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৭.৩ শতাংশ হয়েছে। তবে নিরাপদ পানীয় জলের ক্ষেত্রে অগ্রগতির গতি এবং স্যানিটেশন সেবার বর্তমান অবস্থান ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
গত ১৮ মে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) দেশে সুপেয় পানির সরবরাহ বাড়াতে ইউনিসেফের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। ইউনিসেফের ‘ওয়াশ’ প্রকল্পের প্রধান পিটার জর্জ এল মেস সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে মন্ত্রী এ প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পানি সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে, বিশেষত ঢাকা শহরে।
পানির উৎস থাকলেই নিরাপদ নয়
বাংলাদেশে পানির উৎসের বিস্তৃতি এবং নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এক বিষয় নয়। নলকূপ, পাইপলাইনের পানি কিংবা অন্য উন্নত উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করা গেলেও তাতে আর্সেনিক, জীবাণু বা অন্যান্য দূষণ থাকলে তা নিরাপদ পানীয় জল হিসেবে গণ্য হয় না। ফলে নিরাপদ পানির অগ্রগতি মূল্যায়নে পানির উৎসের সংখ্যা বা সরবরাহের আওতার পাশাপাশি পানির গুণগত মান, প্রাপ্যতা ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির সংকটের ধরনও এক নয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, কোথাও আর্সেনিক দূষণ, আবার শহরাঞ্চলে দূষণ ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে জটিল করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণও দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
স্যানিটেশন ও বর্জ্যপানি পরিশোধনে ঘাটতি
নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করা এসডিজি-৬-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। শুধু শৌচাগার ব্যবহার করলেই এ লক্ষ্য অর্জিত হয় না; মানববর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ, পরিবহন, পরিশোধন ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও থাকতে হয়। শহরাঞ্চলে পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামাঞ্চলে নিরাপদ স্যানিটেশন অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের গৃহস্থালি বর্জ্যপানির মাত্র ১৬.৩ শতাংশ নিরাপদে পরিশোধিত হয়েছে। অর্থাৎ, বর্জ্যপানি পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ও অন্যান্য দূষিত পানি নদী, খাল ও জলাশয়ে মিশলে পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ে।
২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে করণীয়
এসডিজি-৬-এর লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পানীয় জল নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত ও সমতাভিত্তিক স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির সুযোগ তৈরি করা এবং পানিদূষণ কমিয়ে বর্জ্যপানির নিরাপদ পরিশোধন বাড়ানো। এ লক্ষ্য অর্জনে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পানি সরবরাহের মান নিয়ন্ত্রণ, দূষণ পর্যবেক্ষণ, পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের চলমান প্রকল্প, বরাদ্দ, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থায়নের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিরাপদ পানির সেবা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এলাকার মানুষের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আগামী ৮ থেকে ১০ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের জাতিসংঘ পানি সম্মেলন। এসডিজি-৬ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও কার্যকর সমাধান নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা হবে। বাংলাদেশের জন্য এ সম্মেলন পানি ও স্যানিটেশন খাতে অগ্রগতি তুলে ধরার পাশাপাশি ঘাটতি চিহ্নিত করা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চাওয়া এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা সামনে আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
/এসএ/