শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ Breaking News
বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

১৩ অক্টোবর ২০২৬ · FEATURED

মাইনুল হোসেন পিন্নু, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উদ্বেগের বিষয়ে সরকার চিন্তিত নয় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সরকার বাজেটে নির্ধারিত অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে এবং বাজেটের প্রক্ষেপণগুলো পূরণ করতে পারবে বলে আশা করছে। এদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা ও পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)–এর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থসহায়তা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। ওই অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার হতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।

তবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকার অন্য কোনো সংস্থার পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চায় না। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) নিজস্ব হিসাব ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পূর্বাভাস দিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে
বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখনই কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা আগামী কয়েক মাস অব্যাহত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দুই পক্ষের করণীয় এবং সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকাতেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের নীতির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সমঝোতা রয়েছে। বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সংস্থাটি প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে ছিল। আগের সময়ের বিভিন্ন দায়দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এসব বাস্তবতা অনুধাবন করছে এবং বাংলাদেশের পাশে থাকতে আগ্রহী।

তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার যে নীতি গ্রহণ করেছে এবং আগামী দিনের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও গতিপথ নির্ধারণ করেছে, তার সঙ্গে বিশ্বব্যাংক একমত।

অংশীদারত্বের কাঠামো নিয়ে আলোচনা
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি লিখিত প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন সুপারিশ ও পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশও নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরেছে।

তবে এই আলোচনা থেকে কী ধরনের আর্থিক সহায়তা, কর্মসূচি কিংবা উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামো চূড়ান্ত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনা ও পরবর্তী পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হবে।

অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও আলোচনা চূড়ান্ত না হওয়ায় অর্থের প্রাপ্যতা, ছাড়ের সময়সূচি কিংবা ব্যবহারের নির্দিষ্ট শর্ত সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল থাকতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে।

অন্যদিকে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছালে পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে পরিবারগুলোকে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হতে পারে। এতে সঞ্চয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে এটি একটি নির্দিষ্ট মাসের মূল্যস্ফীতির হার। অন্যদিকে আইএমএফের ১০ দশমিক ৯ শতাংশের পূর্বাভাস পুরো ২০২৬–২৭ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে। ফলে দুটি পরিসংখ্যানের মধ্যে তুলনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য বিবেচনায় রাখা জরুরি।

প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি একসঙ্গে দেখা দিলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির পূর্বাভাস
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে।

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি বাড়া ও মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের পূর্বাভাস প্রবৃদ্ধির গতি কমা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার ঝুঁকি নির্দেশ করছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি, বিনিয়োগের পরিবেশ ও উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর দেশের অর্থনীতির গতিপথ নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থসহায়তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সহযোগিতায় রূপ নেয় এবং সরকার অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় কতটা সফল হয়, তা আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

/এসএ/১৩/১০/২৬/