শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ Breaking News
শাহজালালে ট্রলি সংকট, এক বছরেও সমাধান নেই

শাহজালালে ট্রলি সংকট, এক বছরেও সমাধান নেই

৭ অক্টোবর ২০২৬ · সর্বশেষ খবর

মাইনুল হোসেন পিন্নু

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি সংকটে এক বছরের বেশি সময় ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রীরা। ইমিগ্রেশন শেষ করে ট্রলি পেতে অনেক সময় তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। একসঙ্গে দুই-তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করলে সংকট আরও তীব্র হয়। লাগেজ সংগ্রহ করে ট্রলিতে করে বিমানবন্দর থেকে বের হতে কখনও কখনও দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত হজ মৌসুমের আগেই বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত ট্রলি রাখার বিষয়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) লিখিতভাবে সতর্ক করেছিল বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। হজ শেষে হাজিরা ফিরলে ট্রলির সংকট তীব্র হতে পারে এবং এ নিয়ে বিমানবন্দরের ভেতরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা জানানো হয়েছিল।

এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকেও বেবিচককে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে বেবিচকের কেনাকাটা দফতর (সেমসু) থেকে ৫০০টি ট্রলি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সদর দফতরে পাঠানো হয়। তবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি।

এর পরিণতিতে গত ফিরতি হজ মৌসুমে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ট্রলি না পেয়ে যাত্রীরা নিয়মিত ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের ভেতরে মারামারি ও গ্লাস ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর থেকে ২৫০টি ট্রলি এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি ওমরা শেষে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা দেশে ফেরার সময়ও ট্রলি সংকট নিয়ে বড় ধরনের ঘটনা ঘটে। এতে নতুন করে আলোচনায় আসে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই সমস্যা। বর্তমানে যাত্রীদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

ট্রলি কেনার প্রস্তাব আটকে থাকার কারণ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রলি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন না পাওয়ার পেছনে অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি অন্যতম কারণ ছিল। কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেছিলেন, দ্রুতই থার্ড টার্মিনাল চালু হবে। সেটি চালু হলে জাপানি প্রতিষ্ঠান নতুন ট্রলি সরবরাহ করবে এবং সেগুলোর পাশাপাশি বর্তমান ট্রলিও ব্যবহার করা যাবে। ফলে নতুন করে ট্রলি কেনার প্রয়োজন হবে না।

কিন্তু সময় গড়ালেও থার্ড টার্মিনাল চালু হয়নি। অন্যদিকে বিদ্যমান ট্রলির সংকটে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে থাকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কেনার প্রস্তাব থাকলেও বেবিচক একপর্যায়ে অনুদান হিসেবে ট্রলি পাওয়ার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথাও হয়। প্রতিষ্ঠানটি ট্রলি দিতে রাজি হলেও এখন পর্যন্ত সেগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছায়নি।

বিমানবন্দরে কর্মরত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ট্রলি সংকটে যাত্রীদের হয়রানি ও ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত এক বছর ধরে তারা বেবিচককে সতর্ক করে আসছিলেন। তবে তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তাদের প্রশ্ন, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলির সংকট থাকবে কেন? ট্রলি কেনার অর্থ কি অপচয় হবে? তাদের মতে, থার্ড টার্মিনাল চালুর পর সেখানে পর্যাপ্ত ট্রলি পাওয়া গেলে পুরোনো ট্রলিগুলো দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে পাঠিয়ে সেখানকার সংকটও কমানো যেত।

বেবিচকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, শত কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও ৫০০টি ট্রলি কেনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ ট্রলি কেনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও ছিল। তাদের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেননি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ

ট্রলি না পেয়ে যাত্রীদের ক্ষোভ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় ট্রলি না পেয়ে অনেকে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এক নারী যাত্রীকে ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘যদি ট্রলিই দিতে না পারেন তবে বিমানবন্দর কেন বানাইছেন, বন্ধ করে দেন।’

আরেক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, বেবিচকের কি ট্রলি কেনার টাকা নেই, নাকি সমস্যা জিইয়ে রাখার জন্য কৌশলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে?

আরও ৫০০ ট্রলি যুক্ত হওয়ার অপেক্ষা

এ বিষয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের ৪ হাজার ১৯০টি ট্রলি আছে। আরও ৫০০টি যোগ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ৫০০ ট্রলি যোগ হলে ট্রলির আরও কোনও সমস্যা থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে অনেক ফ্লাইট নামলে যাত্রীর সংখ্যা বেশি হয়ে যায়। ঠিক সেই সময়ে ট্রলির ঘাটতি পড়ে যায়। এতে সমস্যার মধ্যে আমরা পড়ে যাই।’